তালেবানের কাছে কাবুলের পতন

প্রকাশিত: ৬:৪৩ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৬, ২০২১
শেয়ার করুনঃ

মার্কিন নেত্বতৃধীন বাহিনীর কাছে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ২০ বছর পর আবার আফগানিস্তানের ক্ষমতা নিতে যাচ্ছে তালেবান। রোববার রাতে রাজধানী কাবুল দখলের মাধ্যমে পুরো আফগানিস্তান নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে তালেবান বাহিনী। প্রায় দুই দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর শত শত বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে গড়ে তোলা আফগান বাহিনী কোনো প্রতিরোধই সৃষ্টি করতে পারেনি।

তালেবান যোদ্ধাদের সঙ্গে লড়াই করে তারা এক সপ্তাহও টিকে থাকতে পারল না। মার্কিন অস্ত্রে সজ্জিত আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিরোধ ব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ে। রোববার রাতে প্রেসিডেন্ট প্যালেস দখল করে নিয়েছে তালেবান। এমন পরিস্থিতিতে ধ্বংসযজ্ঞ এড়াতে তালেবান ও সরকারের মধ্যে ‘শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর’র আলোচনা শুরু হয়। যদিও প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানির দেশ ছাড়ার খবর পাওয়া গেছে। খবর বিবিসি, রয়টার্স, এএফপি ও সিএনএনের।

কাবুলে তালেবানের দুই শীর্ষ কমান্ডার জানান, প্রেসিডেন্ট ঘানি দেশ ছাড়ার পর তারা প্রেসিডেন্ট প্যালেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। তবে আফগান সরকারের পক্ষ থেকে এ দাবির সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি। আফগান প্রেসিডেন্ট প্যালেস এক টুইট বার্তায় জানায়, কাবুলের বিভিন্ন স্থান থেকে গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে। স্থানীয় সাংবাদিক বিলাল সারওয়ারি জানান, তালেবানের সঙ্গে মতৈক্য হয়েছিল ঘানি প্রেসিডেন্ট প্যালেসে ক্ষমতা হস্তান্তরের অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন।

কিন্তু তার পরিবর্তে তিনি ও তার সহযোগীরা দেশ ত্যাগ করেন। প্যালেসের কর্মচারীদেরও চলে যেতে বলা হয়েছে। তালেবানের মুখপাত্র জাহিবুল্লাহ মুজাহিদ গণমাধ্যমকে জানান, তালেবান সহিংসতা থেকে দূরে থাকবে। কোনো কাবুলবাসীর জীবন, সম্পদ কিংবা সম্মান ঝুঁকির মুখে পড়বে না। স্থানীয় টোলো নিউজকে জানান, তালেবান বাহিনীকে কাবুলে প্রবেশ করতে বলা হয়েছে। কাবুলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেই রাখা হবে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।

কাতারের রাজধানী দোহায় অবস্থানকারী তালেবানের এক নেতা জানান, রাজধানী কাবুলে যোদ্ধাদের সহিংসতা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। কেউ শহর ত্যাগ করতে চাইলে, তাকে সে সুযোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নারীদের নিরাপদে অবস্থান করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। কাবুলে তালেবানের প্রবেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিবিসির প্রতিবেদক ইয়ালদা হাকিমও। তিনি জানান, তালেবান যোদ্ধাদের কাবুলে তেমন কোনো প্রতিরোধের মুখে পড়তে হচ্ছে না। এর আগে কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই তালেবান জালালাবাদ শহর দখল করে নেয়। দেশের বেশিরভাগ শহরই অনেকটা বিনা বাধায় দখল করে নেয় তালেবান। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তান তালেবানের শাসনে ছিল। এর মধ্যে সন্ত্রাসীগোষ্ঠী আল-কায়দার নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জোট সেখানে যৌথ অভিযান চালায়, যার মাধ্যমে তালেবান শাসনের অবসান ঘটে।

শনিবার রাতে আফগানিস্তানের উত্তরের মাজার-ই-শরিফ দখলের পর থেকেই সরকারের পতন ঘণ্টা বাজতে শুরু করে। রোববার সকালে জালালাবাদ দখলের মাধ্যমে রাজধানী কাবুলের পতন শুরু হয়। মিছিল নিয়ে শোডাউন করে কাবুলের চারদিক থেকে প্রবেশ করে তালেবান যোদ্ধারা। এ সময় রাস্তায় দিশেহারা হয়ে ছোটাছুটি করতে থাকেন সাধারণ মানুষ। তাদের চোখে-মুখে ছিল ভয়-আতঙ্ক। একটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ টুইট করে জানায়, কাবুলের উপকণ্ঠে সংঘর্ষে ৪০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। তালেবান যোদ্ধারা কাবুলে ঢুকে পড়ার পর এ ঘটনা ঘটে। তবে তালেবানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘জোর করে’ ক্ষমতা দখলের কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। কারও ওপর কোনো প্রতিশোধও নিতে চায় না তারা। শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরে আলোচনা চলছে।

তালেবানের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আফগান সরকার শান্তিপূর্ণভাবেই ক্ষমতা হস্তান্তর করবে বলে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল সাত্তার মির্জাকওয়াল জানিয়েছেন। রোববার স্থানীয় টোলো টিভিতে প্রচারিত এক ভিডিও বার্তায় মির্জাকওয়াল জানান, আফগান জনগণের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। রাজধানীতে কোনো হামলা হবে না। শান্তিপূর্ণভাবে ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’র হাতেই ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। আর এ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসাবে দেশটির সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কূটনীতিক আলী আহমাদ জালালির নাম শোনা যাচ্ছে। আফগানিস্তানের হাই কাউন্সিল ফর ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশনের প্রধান আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ ক্ষমতা হস্তান্তর শুরুর প্রক্রিয়ার মধ্যস্থতা করছেন। দেশটির সংবাদ সংস্থা খামা প্রেসও একই রকম তথ্য দিয়েছে। তবে সরাসরি তালেবানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর হলে সংগঠনটির উপ-প্রধান মোল্লা আবদুল গনি বারাদার দেশটির প্রেসিডেন্ট হতে পারেন। রোববার এক বিবৃতিতে তালেবানও জানায়, শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে তারা ‘অপর পক্ষ’র সঙ্গে কথা বলছেন।

কাবুল বিমানবন্দরে গোলাগুলি : কাবুল বিমানবন্দর এলাকায় গোলাগুলির খবর পাওয়া গেছে। কাবুল বিমানবন্দরে গোলাগুলির পরপরই মার্কিন দূতাবাস নিরাপত্তা সতকর্তা জারি করে। দূতাবাস থেকে আফগানিস্তানে থাকা মার্কিন নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে। মার্কিন দূতাবাসের এক নিরাপত্তা সতর্ক বার্তায় বলা হয়- ‘কাবুলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুতই পাল্টে যাচ্ছে।’ যেসব মার্কিন নাগরিক কাবুল ছাড়তে চান তাদের অনলাইনে নিবন্ধন করতে বলা হয়েছে। এর কিছু আগে বিবিসির সংবাদদাতা ইয়ালদা হাকিমকে সরাসরি টিভি সম্প্রচার চলার মধ্যেই যোগাযোগ করেন তালেবান আলোচক সুহায়েল শাহীন। তিনি বলেন, তারা আফগান জনগণকে ও বিশেষ করে কাবুলে বাসিন্দাদের নিশ্চয়তা দিচ্ছেন যে তাদের জানমাল নিরাপদ থাকবে এবং কারো ওপর কোনো প্রতিশোধ নেওয়া হবে না। তালেবান বলছে, বিমানবন্দর ও হাসপাতালে স্বাভাবিক কাজকর্ম চলবে, জরুরি সরবরাহে বাধা দেওয়া হবে না।

আফগানিস্তানের স্বাধীনতা চায় তালেবান : তালেবানের উপ-প্রধান মোল্লা আবদুল গনি বারাদার ঘোষণা করেছেন, তারা আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে বিশ্বাসী। তবে তাদের মূল লক্ষ্য আফগানিস্তানের স্বাধীনতা। শনিবার এক বিবৃতিতে তিনি এসব কথা বলেন। বারাদার বলেন, তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে চায় না। তালেবান মনে করে, আফগানিস্তানের সব শ্রেণির মানুষ আইনের দৃষ্টিতে সমান। তিনি বলেন, ইসলামি অনুশাসনের আওতায় সব আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতি, মানবাধিকার, সংখ্যালঘুদের অধিকার, নারী অধিকার এবং বাক-স্বাধীনতার প্রতি তালেবান সম্মান প্রদর্শন করে। এছাড়া, তালেবান নারীর শিক্ষা, চাকরি, সম্পদের মালিকানা ও ব্যবসা করার অধিকার প্রদান করবে। আর এসব হবে ইসলামি আইন ও জাতীয় স্বার্থের প্রতি লক্ষ্য রেখে। তালেবানের উপ-প্রধান বারাদার আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সে দেশের সমস্যা সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সমাজের প্রতি আহ্বান জানান।