করোনা মহামারী, মানব সভ্যতার অবক্ষয় ও সম-সাময়িক ভাবনা।সায়েদুর রহমান, অষ্ট্রিয়া।

বিবা নিউজ ডেস্ক বিবা নিউজ ডেস্ক

সারা বিশ্বের প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৪:০১ পূর্বাহ্ণ, মে ১৪, ২০২০
শেয়ার করুনঃ

সায়েদুর রহমান: একটি অস্থির সময় পার করছে বাংলাদেশের মানুষ। করোনার এ মহামারীর সময় মানুষ নিশ্চিত ভাবেই তার মনুষ্যত্ব বিসর্জন দিয়েছে। তা নাহলে মৃত্যু মানুষের লাশ রাস্তায় পড়ে থাকতে পারেনা, অসুস্থ মানুষকে মধ্যরাতে কেউ ঘর থেকে বের করে দেয়না, একমাসের বাসা ভাড়া না দিতে পারার কারণে কাউকে পিটিয়ে মাথা ফাঁটিয়ে সেই দিতে পারে যার মনুষ্যত্বের মৃত্যু ঘটেছে। ছেলে-মেয়ে, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও পরিচিতজন সকলে আজ এ দুর্যোগে হয়ে গেছে পাশবিক, অমানবিক। তাই সৎকারের জন্য লাশ গ্রহণে আজ সকলে অপারগতা জানাচ্ছে, সকলেই সরে যাচ্ছে দূরে। গভীর রাতে সন্তানের লাশসহ বৃদ্ধা মাকে নামিয়ে দিচ্ছে বাস থেকে- আমি ঠিক জানিনা এমন অমানবিক পৃথিবীর মানুষ শেষবার হয়েছিল কখন, কবে? কখন, কবে মানুষ রক্তের বন্ধনকে অস্বীকার করেছিল এমন করে? জাতীয় দুর্যোগ ও মহামারীর এ সময় যখন আমাদের সকলের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশের গরীব, অভাবী ও প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কথা তখন আমরা দেখতে পাচ্ছি ত্রাণসামগ্রী লুটের মহোৎসবে যোগ দিয়েছে আমাদের তথাকথিত জনপ্রতিনিধিরা। আমরা দেখতে পাচ্ছি সরকারের ঘোষিত প্রণোদনার টাকার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছেন দেশের বিত্তশালী ব্যবসায়ী সমাজ। অনেকক্ষেত্রে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা প্রদানে গাফিলতির অভিযোগ উঠছে, রয়ে গেছে চিকিৎসা সামগ্রীর অপ্রতুলতার অভিযোগ। আমার ধারনা করোনার এ দুর্ভোগের পরও বছর শেষে আয় এবং সম্পদ দুটোই বাড়বে সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম নেয়া দেশের ব্যবসায়ী লুটেরা গোষ্ঠীর। বছর শেষে মন্ত্রী, এমপি আর আমলাদের সম্পদের পাহাড় জমবে বিদেশের মাটিতে। দেশের ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠী আবারো ধর্মের নামে ধ্বংসের লীলাখেলায় মেতে উঠবে। ধর্ম ব্যবসায়ীরা পুনরায় গেয়ে যাবে বিভক্তি ও হানাহানির গান। ঘৃণার বানী ছড়াবে, মানুষকে হত্যার কথা বলবে, বলবে দেশ থেকে সংখ্যালঘু ও বিধর্মীদের উচ্ছেদ ও বিতরণের কথা। দেশে সংখ্যালঘুদের জায়গা-জমি আবারো জবর-দখল হবে, আবারো হবে তাদের স্বপ্ন চুরি। দেশের গরীব মানুষ আরো গরীব হবে, বাড়বে নগরে ছিন্নমূল, অভাবী ও নিঃস্ব মানুষের ভীর।

অথচ আমাদের দেখার কথা ছিল এর উল্টোচিত্র। করোনার এ মহামারী হতে আমাদের আত্ম-সংযম ও আত্মত্যাগের শিক্ষা নেবার কথা ছিল। আমাদের দীক্ষিত হবার কথা ছিল সততা ও মিতব্যয়িতায়। আমাদের জীবন আত্মশুদ্ধির পারদে মাপা উচিত ছিল। এ জীবন আসলেই কিছু নয়, যেকোনো মুহুর্তে নিভে যেতে পারে জীবনের বাতি। তাই ভোগ-বিলাস ও অঢেল সম্পদের চিন্তা বাদ দিয়ে আমাদের আত্ম-মানবতার সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করা উচিত ছিল। আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, ‘উপরের আরশে আসলে কেউ নেই, কিছু নেই।’ আমাদের তাই অলৌকিক স্বপ্ন বাদ দিয়ে বাস্তববাদী হতে হবে। আমাদের বিজ্ঞান চর্চায় মনোনিবেশ করতে হবে। যুদ্ধাস্ত্র বাদ দিয়ে জীবন রক্ষাকারী ওষুধের উৎপাদন বাড়াতে হবে এবং এর গবেষণায় নিয়োজিত করতে হবে বিরাট শক্তি। সেনা ছাউনির বদলে গড়ে তুলতে হবে হাসপাতাল, অস্ত্রের বদলে করতে হবে আমাদের গোলাপের চাষ। দেশে দেশে যুদ্ধ বিগ্রহ আমাদের পরিত্যাগ করতে হবে, বন্ধ করতে ধর্মের নামে অযথা এ হানাহানি। বিশ্বের মোড়ল হবার চিন্তা বাদ দিতে হবে, ধনী ও গরীবের ব্যবধান ঘুচিয়ে গড়ে তুলতে হবে সমতাভিক্তিক এক নতুন বিশ্ব। প্রকৃতির সেবায় আমাদের মনোনিবেশ করতে হবে, পৃথিবীর ক্রমাগত উষ্ণায়ন ঠেকিয়ে দিয়ে গড়ে তুলতে হবে আমাদের সবুজ বেষ্টনী। যদি আমরা করোনার এ মহামারী হতে শিক্ষা নিয়ে তা করতে পারি তবে হয়তো বর্তমান মানবসভ্যতা টিকে থাকবে আরো হাজার বছর।তা নাহলে হয়তো অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে আমাদের বর্তমান মানবসভ্যতা এবং আমরা ডাইনোসরদের মত বিলীন হয়ে যাব একেবারে।