মরহুম ফরহাদ আঙ্কেলকে বলছি, ব্যাক্তির মৃত্যু হয় কিন্তুু তার আইডিওলজির মৃত্যু হয়না।”যে শিখা চিরন্তন বহ্নিমান” মোহাম্মদ রুবেল,ভিয়েনা -অষ্ট্রিয়া ।

বিবা নিউজ ডেস্ক বিবা নিউজ ডেস্ক

সারা বিশ্বের প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৪:২৭ পূর্বাহ্ণ, মে ১০, ২০২০
শেয়ার করুনঃ

বিশাল কোন একটি প্রাসাদের একদিক দেখে যেমন পুরো প্রাসাদ সম্পর্কে মন্তব্য করা দূরুহ তেমনি অনেক বড় মানের কোন ব্যাক্তি সম্পর্কে সামান্য জেনে তার সম্পর্কে লিখে অনুভূতি প্রকাশ বাতুলতা বই কিছু নয়।আবার তাজমহল দেখতে যেমন সর্বাঙ্গ সুন্দর তেমনি কিছু ব্যাক্তির যাপিত জীবনবোধের সার্বিকতাও অনুরুপ।এই লেখাটি লিখতে আমি যতটুকু ভেবেছি, যতটুকু সময় নিয়েছি, বোধ হয় আর কোন লেখাতে এতকিছু ভাবিনি।ব্যাক্তি ফরহাদ সাহেব কে সকলে যেমন দেখেছে আমিও তেমনটি দেখেছি খুব কাছ থেকে একটু অন্যভাবে। বস্তুুবাদি এই জীবনে সাধারণ মানুষ তাকে পেয়েছে একজন স্বার্থহীন সমাজ সেবক রুপে, আর আমি পেয়েছি একজন তাত্ত্বিক মহারথী হিসেবে। বলা বাহুল্য হবেকি জানিনা,রক্তের সম্পর্ক থাকলেই যেমন পরমাত্মীয় হয়না তেমনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক হলেই গুরু হওয়া যায়না।জনাব ফরহাদ সাহেব আমার রক্তের সম্পর্কিত কেউ নন আবার আবার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকও নন।কিন্তু, তিনি আমার বাস্তবজীবনের সকল আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিকতার অনেক উর্দ্ধে।

প্রতিটা ক্রিয়ার যেমন সমান বিক্রিয়া রয়েছে, তেমনটি জনাব ফরহাদ সাহেবকে আমি দেখিনি।এই মানুষটা কিভাবে আমার আঙ্কেল হয়ে উঠলেন তা আমি আমার কাঁচা হাতের লিখনিতে বুঝাতে অপারগ। প্রায়শই তাকে আমি একটা কথাই বলতাম, আঙ্কেল আপনি আপনার সম্পর্কে কিছু লিখেন, যা আপনার জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার পল্লবিত ফসল।খানিকটা মৌনব্রত থেকে মৃদুস্বরে বলেছিলেন, আপনি লেইখেন। আমার ক্ষুদ্রতম দৃশ্যমান অক্ষমতার কিন্চিত সক্ষমতা দিয়ে হয়তো একদিন তার ফিলোসোফি লিখতে পারবো সে আশাও দূরুহ হয়ে পড়েছে। কারন এই নন্দিত মানুষটার বিশালত্বের কাছে আমি স্বাবলম্বী নই।একজন মানুষ কতটুকু সভ্য তা পরিমাপের প্রথম মানদণ্ড হলো তার লজ্জাবোধ কতটুকু। দেশের প্রথম স্তরের একটা এলিট পরিবারের সন্তান হয়েও তিনি তার পরিবারের পরিচয় দিতে ইতস্তত করতেন। কারণ আমার পরিবারের ঐতিহ্য তার মত এতোটা সমৃদ্ধ নয়।কতটুকু পড়াশুনা করেছিলেন,কতগুলো পুস্তক পাঠ করেছিলেন,কয়টা স্কলারশিপ পেয়েছিলেন,কোথায় চাকরী করতেন – এসব রাখতেন আলোচ্য সূচির বাইরে। নিজের ঢোল পিটিয়ে অন্যকে বিব্রত করা তার একান্তই অপছন্দ ছিল।

সাহস করে বলতে পারি, মরহুম ফরহাদ আঙ্কেলের সাথে আমার সম্পর্কের সূচক ছিল মহামতি সক্রেটিস আর প্লেটোর মতই।আমি ফরহাদ আঙ্কেলের বিষয়ে একজন নগন্য ন্যারেটর মাএ।প্লেটোর ন্যায় যেখানে আলোচনার পাশাপাশি সমালোচনাও সমান্তরালে চলতে পারে।সাম্প্রতিক সময়ের শ্রেষ্ঠতম তাত্বিক ও আলোচক অধ্যাপক ড.সলিম উল্যাহ খান তার প্রতিটা আলোচনায় তার গুরু আহমদ সফার নাম নেন নৈতিকতার তাগিদে,তেমনি আমি ক্ষুদ্র হলেও তার ব্যাতিক্রম নই। প্রথম যেদিন তাকে আমি দেখলাম, আলোচনার মাঝামাঝি একপর্যায়ে দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন আমি আমার পরকাল ও বেহেশতের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী। অত্যান্ত যুক্তিপূর্ণভাবে তিনি ব্যাখ্যা দিলেন, আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনলাম। আপাদমস্তক ধার্মিক তবে ধর্মান্ধ নন।সর্বজনীন ও সার্বিক বিষয়াদিতে প্রভূত জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও সবজান্তা গুগল সমেত ভণিতার প্রবণতা ছিলোনা তার।শোকাবহ প্রয়ানের মাস ছয়েক আগে ভারাক্রান্ত ও ব্যথাহত মন নিয়ে বলেছিলেন,আমরা এমন সময়ে বাস করছি, যে সময় ন্যায্য দাবির ফিরিস্তি নিবেদন করতে হয় রক্ত দিয়ে।বিদেশের বাঙ্গালীর মনন নিয়ে আলোচনার একপর্যায়ে তিনি বলেছিলেন,আমরা অনেকেই হালাল খাওয়ার জন্য যতটুকু সচেতন, হালাল আয়ের বিষয়ে ততটুকুই বিপরীত। এখানে অবচেতন মনের প্রশ্নই আসেনা।আমাদের টুকটাক লেখালেখি প্রসঙ্গে প্রায়শই ফ্রান্স দার্শনিক জ্যা পল সাএের একটা উক্তি আমাকে শোনাতেন।উক্তিটি ছিল এমন,২০ বছরের তরুণরা ছাড়া ফ্রান্সে কোন মানুষ নেই।কারন ফরাসি বিপ্লব কালীন সময়ে বয়স্করা কথা না বলে গা বাঁচিয়ে চলতো। তারুণ্যের উন্মাদনাকে তিনি চিরাচরিত নিয়মে বোতল বন্ধী না করে প্রস্ফুটিত করার দৃঢ় বাসনা লালন করতেন।

২০১৬ সালে তিনি যখন কমিউনিটি নির্বাচনে পাশ করলেন, শুভেচ্ছা জানানোর জন্য কফি খাওয়ার দাওয়াত দিলাম ওয়েষ্টবান হোফে।সেদিন অভিনন্দন জানিয়ে তীর্যকভাবে প্রশ্ন করলাম, মূর্খদের লীডার হওয়ার মধ্যে স্বার্থকতা কতটুকু খুঁজে পান।একজন আধ্যাত্মিক গুরুর মত মৃদুহেসে বলেছিলেন, সুষ্ঠু ও নান্দনিক রাজনীতিতে আপনার আঙ্কেলের বিকল্প কি? আমি তার সেই প্রশ্নের উক্তর আজো খুঁজে পাইনি।রাজনীতির আদর্শ বলতে কি বুজেন বলতেই তিনি বলেন, আমার পিতৃপ্রদত্ত স্থাবর -অস্থাবর সম্পূর্ণ সম্পদ দান করতে পারলে প্রাথমিক কন্ডিশন পূর্ণহবে।অর্থাৎ, ত্যাগের মাধ্যমে দেশপ্রেম আর সকল কিছুর মেলবন্ধন রাজনীতি। তিনি বিশ্বাস করতেন সেবক যখন শাসক হয় আর দায়িত্ব যখন ক্ষমতা হয় তখনই সমাজে নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়।তার মানবীয় গুণাবলির শ্রেষ্ঠতম দিক হলো সবাই কে আপনি সম্বাধন করে কথা বলা এমনি নিজের একমাএ তনয়াকেও।

ভিয়েনায় দুইজন মানুষের প্রতি তিনি আমাকে ইঙ্গিত করতেন। কারন,হয়তো তিনি বুজেছিলেন তিনি আর বেশিদিন আমাদের মধ্যে থাকবেন না।প্রায়শই বলতেন জনার মানোয়ার পারভেজ সাহেব ও জনাব শেখ সাইফুজ্জামান ভাইয়ের কথা।মৃত্যুর কয়েক দিন আগেও বলেছিলেন এই দুইজন মানুষই আপনার সঠিক প্রিয়জন।ঘোর সংকটে কিংবা আনন্দ অভিষেকে আমি তার যথাযথ ফলাফল প্রত্যক্ষ্য করছি।তার শেষ কথা আজো আমার কানে বাজে। ভালো থাইকেন আঙ্কেল। ভিয়েনা শহর আমার কাছে বড়ই পানসা লাগে কারণ বটবৃক্ষের সেই ছায়া নেই।যাকে আমি শিক্ষক হিসেবে নিয়েছিলাম তিনি সব বিবর্ণ করে চলে গেলেন।আজ ইতালীর মধ্যযুগীয় কবি দান্তের কথা খুব মনে পড়ছে। তিনি তার ‘দ্যা ডিভাইন কমেডিতে ‘ লিখেছিলেন,নরকের শেষস্তরে এমন একদল মানুষ থাকবে, যাদের পূর্ণ জ্ঞান – বোধ- বুদ্ধি থাকার পরও সমাজের বিষয়াদিতে নিরপেক্ষতার ভানধরে চুপ করে থাকবে।

মরহুম ফরহাদ আঙ্কেলকে বলছি, ব্যাক্তির মৃত্যু হয় কিন্তুু তার আইডিওলজির মৃত্যু হয়না।আপনি থাকবেন আমাদের মাঝে আলোচনার টেবিলে,লাইব্রেরির বইয়ের তাকে,সেমিনারের বক্তিতার রেফারেন্স হয়ে।কবি ও নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়রের সনেটের ভাষায় তার প্রতি নিবেদন রইলো তার প্রিয় ভিয়েনাবাসির পক্ষ হতে-

So long as men can breathe,or eyes can see,
So long lives this,